দুর্নীতি, আয়কর ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) আয়কর নথি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের সংশ্লিষ্টতার কথা মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক এ কে এম মর্তুজা আলী সাগর আয়কর নথি জব্দের আবেদন করেন। আবেদনে সিআরআইয়ের টিআইএন নম্বর ৫৭৫৯৪১৯১৬৩০৪-এর অধীনে কর অঞ্চল-৬, ঢাকার সার্কেল-১১৬-এ সংরক্ষিত প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে ২০২৫-২৬ করবর্ষ পর্যন্ত সব আয়কর নথি, স্থায়ী ও বিবিধ অংশসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র জব্দের আবেদন জানানো হয়। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও সিআরআইকে জনকল্যাণমূলক কাজের পরিবর্তে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে আয়কর মওকুফসংক্রান্ত অবৈধ প্রজ্ঞাপন জারি ও গ্রহণ করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুদান হিসেবে ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা গ্রহণ করে সিআরআই। ২০১৩-১৪ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ১০০ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৪৮৬ টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫২১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, সিআরআইয়ের ২৫টি ব্যাংক হিসাবে মোট ২৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার ১৭০ টাকা জমা এবং ১৯১ কোটি ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৯ টাকা উত্তোলন করা হয়। জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে এসব হিসাবে মোট লেনদেনের পরিমাণ ৪৩৯ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪৮০ টাকা। এ ছাড়া ৩৬ কোটি ৫২ লাখ ৭৪২ টাকা আয়কর ফাঁকির মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করার অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, অসদাচরণ ও অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগে সিআরআই-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলাটি করা হয় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায়।
মামলায় সিআরআইয়ের ট্রাস্টি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি সায়মা হোসাইন (সায়মা ওয়াজেদ পুতুল), ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং সিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক শাব্বির বিন শামসকে আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে আয়কর সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আপিলের সদস্য রওশন আরা আক্তার, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকেও আসামি করা হয়েছে।
আদালতের এই আদেশ মামলার তদন্তের স্বার্থে আয়কর-সংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ ও পর্যালোচনার পথ তৈরি করবে। তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগে সেগুলোকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
